আলী সুড়ঙ্গপার্বত্য বান্দরবান জেলার একটি উপজেলার আলীকদম নাম হওয়ার পেছনের ইতিহাস জানা ছিল না। জনশ্রুতি আছে, ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (র.) এর পদধূলি পড়েছিল এখানে। তবে তা স্বশরীরে নাকি অলৌকিকভাবে সে অন্য কথা।

আলীর (র.) পদধূলির ব্যাপারটা যতটা না জনশ্রুতি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এখানকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস। স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের এমনটাই ধারণা।

আলীকদম থেকে পানবাজার পর্যন্ত আমাদেরকে বহণকারী অটোরিকশাচালক জানান, উপজেলা বা বনবিট কার্যালয় প্রাঙ্গণে নাকি একটি পাথর খণ্ড ছিল। যাতে হজরত আলীর পায়ের ছাপ রয়েছে। পাথরটি বর্তমানে দেখা যায় না। আলীর পায়ের ছাপ, স্থানীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস আর ইতিহাস হওয়ার মতো কালের পরিক্রমা- বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবনা যৎসামান্য। এ ছাড়া ইতিহাস করণ-কারণ উদ্ধার বা খণ্ডন করা আমাদের কাজ নয়। সুতরাং, আলীর গুহা বা সুড়ঙ্গ ভ্রমণ কাহিনিতে যাওয়া যাক।

আলী সুড়ঙ্গ
অভিযাত্রীদের মতে, আলীর গুহা এযাবৎ আবিষ্কৃত দেশের সর্ব বৃহৎ গুহা। আর আলীকদমের মতো এই গুহার নামকরণের পেছনেও রয়েছে সেই একই বিশ্বাস বা জনশ্রুতি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকোরিয়া বাসস্ট্যান্ডে নামলাম সকাল সাড়ে ৬টায়। উদ্দেশ্য আলীকদম যাওয়া। বাসে গেলে দুই ঘণ্টা। আর চাঁদের গাড়িতে গেলে ৩০ মিনিট বা ৪০ মিনিট কম লাগবে। দুয়ের মাঝে ভাড়ার তফাৎ মাত্র ১০ টাকা। সকাল ৮টায় গাড়ি এসে স্ট্যান্ডে লাগল। একজন-দুজন করে লোক জড়ো হচ্ছে, এদিকে আমরা রয়েছি ছয়জন। গাড়ি ছাড়তে লাগে আর আটজন যাত্রী।

২০১২ সালে একবার চকোরিয়ায় যাওয়া হয়েছিল। বাসস্ট্যান্ডের এক রেস্তোরাঁয় একটি করে ডিম আর দুই পরোটায় নাস্তা খেয়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে মাথাপ্রতি দাম হাকা হয়েছিল ৫৫ টাকা। মেলাতে পারিনি কীভাবে এত বিল হয়? যার কারণে এবার আর চকোরিয়ায় নাস্তা খাওয়ার সাহস করলাম না। নামে চাঁদের গাড়ি হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়, বরং জাপানি ও ইন্ডিয়ান জিপ কেটে বানানো ছাদ খোলা অথবা রেক্সিনে আবৃত গাড়ি। চাঁদের গাড়ি বলতে যা বোঝায় তা আর সচরাচর চোখে পড়ে না বললেই চলে। এই তো ৭/৮ বছর আগেও দেখা যেত। কিম্ভূতকিমাকার দেখতে, এক সাথে অনেক যাত্রী ধারণ করতে সক্ষম। সেগুলোও জিপ কেটে বানানো, তবে বহু পুরনো। একেবারে ব্রিটিশ আমলের। বর্তমানে এই আজব বাহন কেবল প্রত্যন্ত পাহাড়ি পথে যেমন- খাগড়াছড়ির মেরুণবাজার-বাইট্টাপাড়া অথবা আলীকদম-থানচি রুটে হাতেগোনা দু-একটি চলতে দেখা যায়।

আলী সুড়ঙ্গগাড়িটি প্রবেশ করল পার্বত্য এলাকার মাঝে। দুপাশে রাবার বাগান। দূর থেকে সুন্দর দেখায়। গাছ থেকে রাবারের কাঁচামাল আঠা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ আকর্ষণীয়। রাবার বাগান দেখতে সুন্দর, একই সঙ্গে অর্থকরী হলেও ভেবে দেখার বিষয় তা বাংলাদেশের প্রকৃতি বিবেচনায় কতটা পরিবেশবান্ধব। ২০১০ কি ১১ সালের কথা, খাগড়াছড়ি দিঘীনালা এলাকায় গিয়েছিলাম। এনজিওর বিদ্যালয় থেকে বিতরণ করা একটি-দুটি করে রাবার চারা হাতে নিয়ে ফিরছিল ছোট বাচ্চাদের দল। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম এক ভয়ানক তথ্য। রাবার গাছে নাকি কোনো পাখি বসে না। শুধু তাই নয় কোনো কীটপতঙ্গও বসে না। বিষয়টি অস্বাভাবিক বটে। তাদের ধারণা, রাবার গাছ বাংলাদেশের পরিবেশ উপযোগী নয়। গাড়ি ছুটছে দারুণ গতিতে। আসনের অবস্থা সুবিধার নয়। ২০ মিনিটের মধ্যে কোমরে টনটন ব্যথা শুরু হয়ে গেল। তার ওপর ডানে-বামে বসেছেন দুই প্যাচাল সম্রাট। বাম পাশের ভদ্রলোক বিজিবি সদস্য, চাকমা বা মারমা হয়ে থাকবেন। শুরু থেকে সেই বিরতিহীন কথা -এই জায়গার নাম এই, ওই জায়গা বিখ্যাত অমুক বিষয়ের জন্য, রাবার চাষ, তামাক চাষ, তাকে কেন্দ্র করে পাহাড়িদের নানা সফলতা, সম্ভাবনা প্রভৃতি! কথায় কথায় জানা গেল, তার বাড়িতে পর্যটকদের থাকবার ব্যবস্থা আছে। শুধু তাই নয় বন্দুকও আছে। চাইলে হরিণ শিকার করা যায়। ঢাকা থেকে নাকি অনেকেই গিয়ে হরিণ শিকার করে। কথাগুলো বলে তিনি ভীষণ আনন্দ পাচ্ছিলেন। যখন জিজ্ঞেস করি, ভেবে দেখেছেন কি, এসবের মাধ্যমে পরিবেশ প্রকৃতির কি ভয়ানক ক্ষতিটা হচ্ছে? এমন প্রশ্নের মুখে অবশ্য নিরুত্তর থাকলেন।

আর ডান পাশে বসা স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাঙালি শিক্ষক বিজিবি সদস্যের কথার মাঝে বাদ পড়ে যাওয়া বিষয়গুলো কানের কাছে এসে উচ্চ স্বরে ধরে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাতে মনে হলো উনি স্বার্থক। এমন সুন্দর রামায়ন শোনার পর নিজেও স্বার্থক না হয়ে পারলাম না!

আলীকদম থানা বাজারে পৌঁছে খাবারের দোকানের সন্ধান করলে সর্বাপেক্ষা উন্নত জায়গাটি দেখিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের তো কোনোরকম একটা হলেই চলে সুতরাং মুখের সামনে যেটা পড়ল তাতেই বসে পড়লাম। আসন ছেড়ে স্বত্বাধিকারী নিজে এগিয়ে এলেন। খাবার কী আছে? ভাতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি পদের নাম বললেন। সব বাদ দিয়ে মাছের পদগুলোর মাঝ থেকে বেছে নিলাম রাশু মাছ। টাকি বা বেলে মাছের মতো লম্বা। বাজার থেকে কয়েকশ’ মিটার পেছন দিয়ে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদীর মাছ। স্বাদে নাকি অসাধারাণ। গরম ভাতের সঙ্গে মাছ আর পাহাড়ি সবজি ফাইস্যার তরকারি, আহ! সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

আধা ঘণ্টা বিরতির পর সেনা ক্যাম্পের পাশ দিয়ে নেমে যেতে হল মাতামুহুরীর ঘাটে। এখান থেকেই হাঁটা শুরু উজানে পূর্ব পালং পাড়ার দিকে। মূলত পালং পাড়ার পর থেকেই আলীর গুহা বা সুড়ঙ্গ এর ট্রেইল। রোদের তীব্রতা কম নয়; তবে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে মন্দ লাগছিল না। মাঝে এপাড় ওপাড় করতে হলো কয়েক বার। চকোরিয়া হয়ে পার্বত্য এলাকায় প্রবেশের পর থেকে যা দেখলাম এখানেও ঠিক একই জিনিস। নদীর ধারে উর্বর সমতল জমি জুড়ে তামাক খেত। পার্বত্য এলাকার প্রত্যন্ত জায়গাগুলোতে ব্যাপক হারে তামাক চাষ চলছে। বিষয়টিকে শুভ দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ অছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া তামাক চাষের এই সার্বিক কার্যক্রমকে একটু সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, পর্বতের আড়াল, আবডাল আর স্থানীয়দের সরলতার সুযোগে যেন এক ধরনের ছলচাতুরির খেলা চলমান।

পালং পাড়ার একমাত্র ছোট্ট চায়ের দোকানটিতে ব্যাগ রেখে হালকা হতে হলো। মাতামুহুরীর ওপাড় থেকেই ট্রেইল এগিয়েছে উপরের দিকে। শুরুতেই সামনে পড়ে এক সাইনবোর্ড। সার্বিক উন্নয়ন ও পর্যবেক্ষণে উপজেলা প্রশাসন বা বন বিভাগ, এমন কিছু একটা লেখা। সামান্য গিয়েই চোখে পড়ে পর্যবেক্ষণের নমুনা। একেবারে পথের মাঝখানে কয়েকজন শ্রমিক গাছ কেটে নির্দিষ্ট একেকটি আকার দেওয়ায় ব্যস্ত। সম্মুখেই একটি ফাঁটলের মুখ। মুখে পা রাখতেই আবহাওয়ার এক আকস্মিক পরিবর্তন অনুভূত হলো। যেন দরজা ঠেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে প্রবেশ করলাম। ফাঁটলের মেঝে জুড়ে কোথাও কোমর পানি তো কোথাও স্যাঁতস্যাঁতে পাথুরে মাটি। কয়েকশ মিটার যাওয়ার পর ফাঁটলটি দুই ভাগ হয়ে গেছে। তাবলিগ জামাতে আসা একটি দলের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।

নানা বয়েসি লোকগুলো জামাতের কাজের মাঝে সময় বের করে নিয়ে অনেক কষ্টে সেখানে গিয়েছিলেন। গুহা দেখে মুগ্ধ মুসল্লিগণ শুকরিয়া জ্ঞাপন পূর্বক জানান, যান গিয়ে দেখে আসুন আল্লাহর কুদরত, কী বানিয়ে রেখেছেন! তাদের পরামর্শে ডান পাশের পথ ধরে গুহা মুখের নিচে গিয়ে উপস্থিত হই। এবার চোখে পড়ল সাইনবোর্ডের মাহাত্ম- গুহা মুখে আরোহণের জন্য ১৫/২০ ফুট উঁচু একটি লোহার সিঁড়ি। রেলিং বহু আগেই খুলে পড়েছে। নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পর চূড়ান্ত পর্যায়ের জায়গাটুকু বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একটু এদিক সেদিক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা। একটির মাথায় একটি; কয়েকটি গামছা বেঁধে তার সাহায্যে আরোহণ করতে হল। টর্চের আলো ছাড়া প্রবেশ করা অসম্ভব, কিছু দূর যাওয়ার পর সুড়ঙ্গ চলে গেছে দুই দিকে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, হাঁটু গেড়ে চার হাত পায়ে খানিকটা হামাগুড়ি দিয়ে এগোলে হেঁটে যাওয়া যায়। ধারণা করা যায়, কোনো এক সময় প্রচুর বাদুরের বসবাস ছিল এখানে। মানুষের যাতায়াতের কারণে অনেক আগেই তারা পালিয়েছে। কে জানে, আদিমকালে হয়তো মানুষেরও বসবাস ছিল।

প্রথম গুহা থেকে বেরিয়ে সেই বিন্দুতে ফিরে আসি, যেখান থেকে ফাঁটল দুই ভাগ হয়ে গেছে। এবার এগিয়ে যাই অন্য দিকটায়। সরু ফাঁটল, তার মধ্যে ভেঙে পড়ে রয়েছে শতবর্ষী বৃক্ষের মোটা ও দীর্ঘ কাণ্ড, খানিকটা পথ তার ওপর দিয়েই চলতে হয়। পথের একপর্যায়ে পাশে ছোট্ট সুড়ঙ্গ। শরীরটা বাঁকিয়ে প্রবেশ করতে হয়। খানিক ওপরের দিকে উঠে এখানেও হামাগুড়ি দিয়ে কয়েক মিটার অগ্রসর হওয়ার পর বেশ ফাঁকা। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে এদিক সেদিক। সহজেই অনুমান করা যায়, সমস্ত পাহাড়টা জুড়েই রয়েছে অনেক গুহা পথ এবং কোনো না কোনোভাবে প্রতিটিই সংযুক্ত। যেতে যেতে পৌঁছে যাই অন্য প্রান্তের মুখে। উপর থেকে নেমে এসেছে লতাপাতা। তার ফাঁক গলে প্রবেশ করছে তীর্যক আলোর সরু রেখা।

কিংবদন্তির আলীর সুড়ঙ্গ

আপনার মতামত দিন....

মতামত