ফারুখ আহমেদ
থেগামুখথেগামুখে যাওয়ার পথে দেখা যাবে প্রকৃতির এমন রূপ। ছবি: লেখক‘নদীর এই বাঁকটা অনেক বেশি মোহময়’—নাদিয়ার মুখের কথা শেষ না হতেই দেখি চিকিৎসক নাজমুল হক নদীর বাঁকের ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারপর যতই সামনে এগিয়েছি, কর্ণফুলী নদীর প্রতিটা বাঁক আমাদের শুধুই মুগ্ধ করেছে, বিস্ময়ভরে তাকিয়ে দেখেছি। কখনো ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়েছি, আবার কখনো প্রকৃতি উপভোগ করে করে এগিয়েছি। পুরো দুই দিনের প্রায় ২৫ ঘণ্টা আমরা কর্ণফুলী নদীতে ভেসে বেড়িয়েছি। অসাধারণ ছিল সে নদীপথে চলার প্রতিটি মুহূর্ত।

ঠেগামুখ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন থেগামুখ। এখানে চাকমা ও মারমা নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। থেগামুখের কথা জেনেছিলাম আগেই। সেই জানাটাকে উসকে দিয়েছিল বন্ধু সমীর মল্লিক। শুরু হলো পরিকল্পনা। বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ এল বাংলা নববর্ষের ছুটিতে। প্রথম আলোর রাঙামাটি প্রতিনিধি হরি কিশোর চাকমা ও বন্ধু গ্লোরি চাকমার সহযোগিতা নিলাম। নয়জনের দল নিয়ে আমরা রওনা হলাম। ১৩ এপ্রিল রাতে দেশ ট্র্যাভেলসের বাসে চললাম রাঙামাটির উদ্দেশে। নববর্ষের দিন রাঙামাটি থেকে পরদিন ভোরবেলা মিল্টন চাকমার ট্রলারে চেপে থেগামুখের উদ্দেশে সমতাঘাট থেকে শুরু হলো যাত্রা।

ঘণ্টা খানেক চলার পর পাহাড় ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধমূর্তি দেখে প্রথম যাত্রাবিরতি টানতে হলো। এভাবেই শুভলং, বরকল ও বাঙালটিলা হয়ে ঠিক সন্ধ্যায় আমরা ছোট হরিণা পৌঁছাই। সীমান্ত এলাকা, তাই নায়েক রহমতের পরামর্শে সেদিন আর সামনে না গিয়ে ছোট হরিণাতেই রাত কাটালাম আমরা।

পরের দিন ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। অন্ধকার ভেদ করে আমরা যখন বের হলাম, সময় তখন ভোর চারটা হবে। ট্রলার চলা শুরু করতেই অনুভব করি স্বপ্নের মতো ঠান্ডা হাওয়া বইছে, চারিদিক ঝিরঝির। আমরা টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার গ্রাম ছোট হরিণা থেকে এগিয়ে চলি বড় হরিণার দিকে। বড় হরিণাতে আমাদের আবার যাত্রাবিরতি দিতে হয়। বড় হরিণা সীমান্তচৌকি বা বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) আমাদের থেগামুখ যাত্রার বিষয়ে তথ্য জানানো ছিল। নাম লিখিয়ে বিজিবির দেওয়া হালকা চা-নাশতার আতিথেয়তা নিয়ে তবলাবাগ হয়ে ছুটে চলি থেগামুখের দিকে।

আবারও হুহু ঠান্ডা বাতাস আমাদের জড়িয়ে ধরল। আরাম পেয়েই কিনা সঙ্গী-সাথিরা ঘুমের অতলে তলিয়ে পড়ে। আমি না ঘুমিয়ে সারা রাতের ক্লান্তি সরিয়ে ট্রলারের ছাদে গিয়ে বসি। একটু পর দেখি আনিচ মুন্সি চলে এসেছেন। তারপর নওরিন এবং তারও পরে নাদিয়া চলে এল। এভাবে এক এক করে সবাই চলে আসে ট্রলারের ছাদে। এরই মধ্যে পুব আকাশে আলো দেখা দিয়েছে। তবে আকাশের গা থেকে পুরোপুরি অন্ধকার তখনো মুছে যায়নি। প্রচণ্ড গরমের দিনেও কেমন কুয়াশাভেজা প্রকৃতি। মধ্য এপ্রিলেও ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। সূর্যের আলোরা পাখা মেলতেই কর্ণফুলী নদী চকচক করে উঠল। পাখির ডাক ছিল আলো ফোটার আগে থেকেই, এবার শুরু হলো আমাদের কিচিরমিচির। দুপাশে পাহাড় আর সে পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদী দিয়ে বড় হরিণা পেছনে ফেলে ট্রলার এগিয়ে চলল আরও সামনে বাংলাদেশের শেষ এবং সীমানা গ্রাম থেগামুখের দিকে। এখানে আমাদের ট্রলার ও এলাকার অন্যান্য ট্রলারের সঙ্গে ভারতের পতাকাবাহী ট্রলার চলতে দেখে দারুণ রোমাঞ্চিত আমরা। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, মনে মনে ভাবলাম সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক একেই বলে।

থেগামুখ বিওপির প্রবেশমুখটা টাইটানিক জাহাজের মতো। ধারণার চেয়ে আধা ঘণ্টা দেরিতে থেগামুখ পৌঁছানোয় থেগাদোরের আঞ্চলিক কমান্ডার তাঁর উৎকণ্ঠার কথা জানালেন। তারপর হালকা নাশতায় আপ্যায়িত করলেন। নাশতা সেরে এবার আমরা বের হই থেগা গ্রাম ঘুরে দেখতে, পাশেই সাজেকের দিকে বয়ে গেছে থেগা নদী।

থেগামুখ সম্পর্কে যেমন ভেবেছিলাম তার উল্টোই দেখলাম। দুর্গম এলাকা হলেও সীমান্তঘেরা থেগামুখ বা থেগাদোর গ্রাম ছিমছাম, বেশ সাজানো-গোছানো। এখানে ১০০ পরিবারের বসবাস। তার মানে সব মিলে এখানে ১০০টির মতো বাড়ি বা ঘর আছে। একটা চমৎকার বাজার আছে। এখানকার কারবারি বা গ্রামপ্রধানের নাম পুলিন চাকমা। একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন ক্লাস চলছিল। আমাদের দেখে ছাত্ররা বের হয়ে চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। তারপর আমাদের ক্যামেরায় পোজ দেওয়া শুরু করল। এখানে রেস্ট হাউস বা রাত্রি যাপনেরও ব্যবস্থা আছে। রেস্ট হাউস বলতে চাকমা বা মারমাদের ঘর। খাবার হোটেল আছে, খেতে চাইলে আগে থেকে ফরমাশ দিয়ে রাখতে হবে। রেস্ট হাউসে আশপাশের এলাকার লোকজন বা পাশের ভারতের মিজোরামের ডেমাক্রির অতিথি ছাড়া অন্য আর কারও থাকার সৌভাগ্য হয়নি, খাবার ব্যবস্থাও তাঁদের জন্যই জানালেন কারবারি পুলিন চাকমা। সপ্তাহের বুধ ও শুক্রবার এখানে হাট বসে। সেই দুই দিন এলাকা বেশ সরগরম থাকে। হাটে আসা ক্রেতার বেশির ভাগই ওপার মিজোরামের। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। স্কাই টিভির অ্যানটেনা প্রতিটি ঘরে ঘরে। আমরা পুরো গ্রাম ঘুরে থেগামুখ বাজারের বটগাছ তলায় বসে কারবারি পুলিন চাকমার আতিথেয়তা নিই। চা-বিস্কুট খাই, সঙ্গে মিজোরামের কোমল পানীয়। এভাবেই থেগামুখে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে লুসাই পর্বতমালা বা মিজোরামের নীল পাহাড়ের (ব্লু মাউনটেইন) জলধারার স্রোতের মিলনস্থল কর্ণফুলী নদীর উৎসমুখ দেখে আমরা ফিরতে থাকি। থেগামুখ তখন পেছনে।

.প্রয়োজনীয় তথ্য
রাঙামাটি থেকে ছোট হরিণা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল রয়েছে। ছোট হরিণা পর্যন্ত সাধারণের চলাচলের অনুমতি, তারপর আর নেই। বড় হরিণা হয়ে থেগামুখ যেতে হলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। অনুমতির জন্য রাঙামাটির জিএসও (ইন্টেলিজেন্স) ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড বরাবর আবেদন করতে হবে। অনুমতি মিললে রাঙামাটি হয়ে সমতাঘাট বা রিজার্ভ বাজার থেকে ছোট হরিণা হয়ে থেগামুখ। যাত্রাকালে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানি সঙ্গে রাখবেন। থেগামুখে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে। এক কিংবা দুই রাত আপনাকে ছোট হরিণা থাকতে হবে। রাত্রি যাপনের জন্য ছোট হরিণার বিদ্যুৎ ও টয়লেটবিহীন রেস্ট হাউসের ছোট্ট ঘরই একমাত্র ভরসা। দু-তিনটা খাবারের হোটেল থাকলেও আগে থেকে ফরমাশ না দিলে খাবার পাবেন না।

ঘুরে আসতে পারেন অপার সৌন্দর্যের থেগামুখ

আপনার মতামত দিন....

মতামত