নানান ধরনের ফুলের গাছ সড়কে। সারি সারি গাছে ফুটে আছে ফুল। আছে কৃষ্ণচূড়ার শোভা। গাছে পাখপাখালির ঝাঁক। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ। সবুজে ঘেরা প্রকৃতি সেজেছে তার নিজস্ব রূপে। এভাবেই সেজে উঠেছে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সংলগ্ন ভিআইপি সড়ক। গত শনিবার সকালে ওই সড়কে গিয়ে মিলল প্রকৃতির স্পর্শ।

সড়ক বিভাজকে মাটি ভরিয়ে লাগানো হয়েছে নানান ধরনের ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ। সড়কের দু’পাশেও লাগানো হয়েছে এসব গাছ। রূপমাধুরীতে তপ্ত গ্রীষ্মকে রাঙিয়ে দিতে আছে কৃষ্ণচূড়া। সড়ককে পুষ্পশোভিত করে তুলতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে উজ্জ্বল হয়ে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়াগুচ্ছ।

দিনে অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে তাপমাত্রা অনেক কম। তাই সহনীয় তাপমাত্রায় প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে চলে আসেন অনেকেই। কেউ বা আসেন ফুল বিছানো পথের যাত্রী হতে।

এই পথ ধরে হাঁটছিলেন পতেঙ্গার স্টিলমিলের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ফাঁকা সড়কে ফুলের বাগান আর সবুজের সমারোহ আমাকে মুগ্ধ করে। মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করা এই প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। তাই সকালে হাঁটতে আসা।

চার তরুণ প্রাইভেট কার থামিয়ে বসে পড়লেন সড়কের পাশে সবুজের ছায়ায়। তাদেরই একজন আরিফুর রহমান বললেন, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাগান চোখে পড়ে। তাই থমকে দাঁড়ালাম। বাহারি ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। এই ধরনের প্রকৃতি মনকে প্রশান্ত করে। মন স্নিগ্ধতার স্পর্শ পায়।

ভিআইপি সড়কের নেজাম মার্কেট এলাকার বাসিন্দা আজিজ আহমেদ বলেন, ২০১০ সালে সড়কে ফুলসহ বিভিন্ন জাতের গাছ লাগানো হয়। এখন গাছগুলো বেড়ে উঠায় সড়কটির সৌন্দর্য বেড়েছে। তাই সকালে হাঁটতে আসা এবং বিকেলে খোশগল্প করতে আসা মানুষের ভিড় বাড়ছে। তারা ছবি তুলছে ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সংলগ্ন ভিআইপি সড়কে অনিন্দ্য সুন্দরের নান্দনিক এই গল্পটির রচয়িতা ড. হাছান মাহমুদ। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকাকালে এখানে গাছগুলো লাগানোর উদ্যোগ নেন তিনি। সৌন্দর্যবর্ধনের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বনবিভাগের তৎকালীন সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) কাজী আবদুল ওয়াদুদ বলেন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ স্যারের সদিচ্ছায় বিমানবন্দরের সারে চার কিলোমিটার নতুন সড়কে আমরা সাড়ে চারহাজার এবং বোটক্লাব অংশে পাঁচশ কৃষ্ণচুড়া, রাধাচুড়া লাগাই। কৃষ্ণ আর রাধার ফাঁকে গুল্মজাতীয় দয়ার্ফ জারুল, অ্যালমন্ডা, রঙ্গন গাছও লাগিয়েছি আমরা। শুরুর দিকে কিছু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রয়ে যাওয়া গাছগুলো বড় হয়ে এখন বিমানবন্দরসহ আশপাশের চেহারা পাল্টে দিয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ সুরক্ষা ও সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য এই প্রকল্পটিকে অনুসরণ করা যেতে পারে। ঢাকা বিমানবন্দরে ব্যয়বহুল বনসাই না লাগিয়ে এই ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায় কিনা তাও ভেবে দেখতে পারেন কর্তৃপক্ষ। যোগ করেন বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (উত্তর) কাজী আবদুল ওয়াদুদ।

চট্টগ্রাস উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হুমায়ুন কবির বলেন, বাহারি ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, সবুজ সড়কটি দেখে বাইরে থেকে আসা অতিথিরা দেশ সম্পর্কে ভালো একটি ধারণা পাচ্ছেন।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমি জানি যে, একটা পরিবেশকে সুন্দর করার জন্য অনেক টাকা খরচ করেও সুন্দর করা যায়, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সাথে পরিবেশ কতটুকু সংরক্ষিত হয় সেটা একটি প্রশ্ন। গাছ লাগালে যেটা হয় পরিবেশ সুন্দর হয়, নির্মল হয়, সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় এবং একই সঙ্গে এই গাছ লাগানোর কারণে রাস্তার ধারে মাটি সরে যায় না। সেটি ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়, পানি ধরে রাখে। তাছাড়া অনেক ধরনের কল্যাণ আছে। মূলত সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে আমি এই উদ্যোগটি নিয়েছিলাম।

কৃষ্ণচূড়া, রাধাচুড়া কেন, অন্য কিছুতো লাগানো যেতো এমন প্রশ্নে সাবেক এ পরিবেশমন্ত্রী বলেন, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া লাগানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে বিমানবন্দর সড়কে যখন কৃষ্ণচূড়ায় ফুল ফোটে তখন সেটি লাল হয়ে অন্যরকম এক পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এখন হচ্ছেও তাই। মূলত সেকারণে কৃষ্ণচূড়া লাগানো হয়েছে।

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিমান থেকে নেমে এই পথ ধরে যখন আমার গাড়ি চলে তখন দুপাশের সৌন্দর্যে মন ভরে যায়। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাই প্রকৃতির কাছে, পুষ্পশোভিত জগতে। শুধু আমি নই, পর্যটকের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি লোকজন বিমান থেকে নেমে শহরের দিকে টার্ন নিতেই এই সৌন্দর্য অতিক্রম করবেন, উপভোগ করবেন। ফুল আর প্রকৃতি রাস্তার দুই ধারে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যে কেউ সিক্ত হবেন ফুলের উষ্ণতায়। মূলত এমন একটা নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে এই উদ্যোগ নিয়েছিলাম। শুধু এখানে নয়, আমার গ্রামেও পার্বত্য চট্টগ্রামের যে প্রান্ত থেকে আমার গ্রাম শুরু, সেখান থেকে আমাদের গ্রামের রাজার হাট পর্যন্ত কৃষ্ণচুড়ায় লাগিয়েছি। যোগ করেন হাছান মাহমুদ।

পরিচর্যার অভাবে এখানকার সৌন্দর্যহানি ও গাছ নষ্ট হওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক এই পরিবেশমন্ত্রী বলেন, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া লাগানোর শুরুর দিকে ৩০ শতাংশ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল। যারা এতে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রায় তিনবছর এগুলোর দেখভাল ও পরিচর্যা করেছে উপকূলীয় বনবিভাগ। এগুলো পরিচর্যা করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় জনসাধারণের। কারণ বছরের পর বছর পাহারা দেওয়ার মতো জনবল বনবিভাগের নেই।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়কে কৃষ্ণচূড়ার অভ্যর্থনা

আপনার মতামত দিন....

মতামত