দুপপানি ঝরনা‘পাহাড়’—এই তিন অক্ষরের শব্দটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রহস্য-রোমাঞ্চ আর অজানা আনন্দের শিহরণ। আঁকাবাঁকা সবুজে ঘেরা চিকন পথটা ঠিক কখন যে দম বন্ধ করা সৌন্দর্যের একেবারে মুখোমুখি করে দেবে, তার কোনো ঠিক নেই। এ-গাছের পাতা সরিয়ে, ও-গাছের ডাল বাঁকিয়ে, সামনের আকাশ-সমান মাটির দেয়াল ডিঙিয়ে সবার ওপরে উঠে যাওয়ার, সবকিছুকে জয় করার আনন্দটাও কম নয়। এরপরও চোখের দৃষ্টিতে কাঁপন ধরানো সাদাটে ঝরনার পানি দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকে না।

এবার আমাদের গন্তব্য ছিল রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ির দুপপানি ঝরনা। অনেক অনেক দিন পরে কোনো ঝরনা দেখে স্রেফ বোবা বনে গিয়েছিলাম কয়েক মুহূর্ত।

দুপপানির রহস্য

দুপপানি ঝরনা ঘিরে একটা রহস্য রয়েছে—এখানে রোববার ছাড়া যাওয়া যায় না। এই ঝরনার ওপরে একজন সাধু তাঁর আশ্রমে ধ্যান করেন। স্থানীয় ভাষায় এই ধর্মযাজক সাধুকে বলা হয় ‘ভান্তে’, এই ছয় দিনে ভান্তে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি পছন্দ করেন না। তিনি সপ্তাহের ছয় দিন ধ্যান করে শুধু রোববারে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নেমে আসেন। তাই শুধু রোববারেই ঝরনাটায় লোকজনের যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ঈদের আগে এক রোববার পেয়ে গেলাম ছুটি। কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটা হাতে ধরে চড়ে বসলাম রাঙামাটির রাতের বাসে, সঙ্গী হলেন ফেসবুক পেজ ওয়াইল্ড অ্যাডভেঞ্চারের আরও ছয়জন। আমরা যারা জল-জঙ্গলে ঘুরতে পছন্দ করি, তারা ফেসবুকে এই পেজটা খুলেছি।

কাপ্তাই-বিলাইছড়ি-উলুছড়ি

দুপপানি ঝরনাঈদের আগের যানজট পুরো দিনটাকে কুড়মুড় করে খেয়ে ফেলল। কাপ্তাই পৌঁছালাম বেলা দুইটায়। সেখান থেকে ছইওয়ালা বড় একটা ট্রলার দুই দিনের জন্য ভাড়া করলাম ছয় হাজার টাকায়। ট্রলার আমাদের নিয়ে পাড়ি জমাল কাপ্তাই হ্রদ ধরে বিলাইছড়ির দিকে। বিলাইছড়ি পৌঁছতে বিকেল পাঁচটা। সেখানে আমরা থেকে গেলাম সেদিন। পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই কালচে কাপ্তাই চিরে ঢুকে পড়ব দুপপানি ঝরনার এলাকায়, যার নাম উলুছড়ি।

ভোর পাঁচটায় যখন ভোরের বাতাসের ঘুম ভাঙিয়ে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে উলুছড়ির দিকে যাচ্ছি, তখন স্থানীয় সেনাবাহিনী ক্যাম্পের লোকজনেরও চক্ষু চড়কগাছ। তাঁদের কাছে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আবার ছুটলাম পাহাড়ের ডাকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমরা উলুছড়ি পৌঁছলাম।

একেবারেই ছিমছাম, শান্ত, চুপচাপ একটা গ্রাম। গ্রামের মানুষ জানেও না, তারা কী অসাধারণ একটা একটা রত্ন নিয়ে বসে আছে! এক পাশে পাহাড় আর অন্য পাশে ধানখেত নিয়ে একটা আস্ত নদী কোলে করে শুয়ে আছে উলুছড়ি, এখানে নদীর ঘোলা পানি আর হইহই করে ধেয়ে আসা স্রোতই জানান দিচ্ছে, ভেতরে কী শক্তিশালী উৎস রয়েছে। চোখ বড় বড় করে সে উৎসের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা, যে পানির স্রোতই এত, সেই পানির উৎস না জানি কত বড়। একজন গাইড নিয়ে সামনের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। পরের কয়েক ঘণ্টা এই গাইডই আমাদের জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ থেকে বারবার উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন। ৪৫ কেজি ওজনের এই গাইডের নাম প্রীতিময়।

রোমাঞ্চকর জঙ্গলে

জঙ্গলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিময়ের হুংকার—সবাইকে প্যান্ট খুলতে হবে! বলে কী! তাঁর কথা শুনে জাফর তো পিছলেই পড়ল। টুপ করে গলা-সমান কাদাপানিতে ডুবে গিয়ে ভুস করে মাথা বের করে জানতে চাইল, কেন? শান্ত, চুপচাপ ধীরস্থির প্রীতিময় বললেন, ওখানে কোমর এবং গলা-সমান পানি। ওটা পার হতে হলে শার্ট-প্যান্ট হাতে নিয়ে পার হতে হবে! তাঁর হাত অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে তাজ্জব বনে গেলাম। মাইল খানেক বিশাল এক জলাশয় চোখের সামনে, সেখানে আবার শাপলা শালুক ফুটে আছে। এটা পেরোনোর চিন্তা স্বাভাবিকভাবে আসে না। শাহেদের মুখ দিয়ে ফুস করে বেরিয়ে পড়ল, শুরুতেই এমন অ্যাডভেঞ্চার! না জানি সামনে আর কী কী আছে!

টানা আধা ঘণ্টা এই পানিপথের যুদ্ধ শেষ করে নিজেদের আবিষ্কার করলাম, মাত্রই পেকে সোনালি হয়ে ওঠা ম-ম সুগন্ধ ছড়ানো ধানখেতে। আমাদের সাঁতার না জানা বন্ধু খয়রুল ঘোষণা দিল, এই জীবনে সে যত দিন বেঁচে থাকবে, ভুলেও আর এ পথে পা মাড়াবে না। এরপর শুধুই হাঁটাপথ, সমতলে ঘণ্টা খানেক হেঁটে হেঁটে ছোটখাটো অনেক খাল পার হলাম। একবারও মনের মধ্যে আসেনি যে এই খালগুলোই ফেরার সময় হয়ে উঠবে মরণফাঁদ! সমতলের শেষ মাথায় কলাবাগানের সারি, পাকা কলার রাজত্ব পেরিয়ে হাঁটুপানির এক নদী ডিঙিয়ে এসে দাঁড়ালাম পাহাড়ের একেবারে গোড়ায়, মাথার ওপরে প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া একটা পাহাড়ি পথ উঠে গেছে।

দুপপনি ঝরনা
বাপ্পী আর শুভ্রর এই প্রথম এত বড় পাহাড় দেখা, বোতলের পর বোতল পানি, স্যালাইন আর গ্লুকোজ বিসর্জন দিতে হয়েছে তাদেরকে এই চূড়ায় ওঠার জন্য। ছড়ছড় করে পিছলে পড়ে স্যান্ডেল হারিয়ে ফেলেছে শাহেদ, প্রতি মিনিটে দুবার করে আছাড় খেয়ে পাহাড়ের উচ্চতা কয়েক মিটার দাবিয়ে দিয়েছে জাফর, অন্যদের টেনে তোলার সময় পড়ে গিয়ে পাহাড়ে নতুন নতুন গিরিখাদ তৈরি করে ফেলেছে খয়রুল, আর সবার থেকে আলাদা হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে সকালবেলায় তিরিশটা সেদ্ধ ডিম আর বাইশটা কলা খেয়ে পাহাড়ে আসা জটাধারী আহসান ভাই। তাঁর এক পায়ে স্যান্ডেল, অন্য পা খালি। এক পাহাড়ের এত রূপ এর আগে দেখিনি। এখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সব ঝরনার সব কটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

হাত বাড়ালেই মেঘ

জঙ্গলের বুনো গন্ধ মাতোয়ারা করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত, হাত বাড়ালেই মেঘের ছোঁয়া, পা বাড়ালেই জংলি ফুলের স্পর্শ, চোখ মেললেই মাইলের পর মাইল পাহাড়ের সারি। বিধাতা খুব যত্ন করে এই পাহাড়টাকে সাজিয়েছেন—ঠিক যেখানে যা থাকার কথা তেমন করে। সবই ঠিক ছিল, শুধু জাফর ছাড়া!

এক পাথুরে পিচ্ছিল পথ ধরে সবার আগে উঠে গেল জাফর। এরপর বলা নেই কওয়া নেই, দুম করে পুরো পাহাড় কাঁপিয়ে পিছলে পড়ে গেল সে। চোখের সামনে একটা আস্ত জাফর উড়ে এসে পড়ল ক্যাসকেইডের নিচের জমানো পানি আর পাথরের গুঁড়ির স্তূপে, কয়েক মিলিমিটারের জন্য বেঁচে গেল তার মাথাটা। ভয় ধরানো ট্রেইলের সূচনা হলো সেখানেই। এরপরই আমরা আবিষ্কার করলাম, এই পাহাড় কতটা ভয়ংকর। গোলাপে যেমন কাঁটা থাকে, তেমনি পাহাড়ের সৌন্দর্যে থাকে পিচ্ছিলতার গল্প।

অবশেষে দুপপানি ঝরনায়
সবকিছু পার করে আমরা পৌঁছে গেলাম দুপপানি পাড়ায়। এখান থেকেই নিচের দিকে গেলে দুপপানি ঝরনা। পাড়া থেকে রাজয় নামের আরেকজন গাইড নিয়ে হেঁটে চললাম আরাধ্য সেই ঝরনার উদ্দেশে।

দুপপানি ঝরনায় নামার রাস্তাটা একেবারেই জাদিপাই ঝরনায় নামার রাস্তার মতো। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এ-গাছের মাথা ধরে ও-গাছের গলায় ঝুলে, সে-গাছের পেট জড়িয়ে, ঝুরঝুরে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়তে হয় এখানে। তারপর আলীবাবার চিচিং-ফাঁকের মতো এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ—তার ওপাশেই অতিকায় দুপপানি ঝরনা! প্রকৃতি নিজ হাতেই যেন এই সুড়ঙ্গ বানিয়ে রেখেছে, অনেক বড় কিছুর সামনে মানুষকে যেমন মাথা ঝুঁকিয়ে ঢুকতে হয়, এই সুড়ঙ্গ ঠিক তেমনই। এখান থেকে বের হয়ে মাথা ওঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সামনে ধরা দিল আমার দেখা এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ঝরনা। দুধের মতো ধবধবে পানির ধারা কতটা ওপর থেকে কী তীব্র বেগেই না নিচের দিকে পড়ছে! আধেক চাঁদের মতো আকৃতি নিয়ে কয়েক লাখ সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে বিশাল গর্জন নিয়ে আর সবাইকে জানান দিচ্ছে তার বিশালতা। ঝরনার নিচে টলটলে স্বচ্ছ পানি, সেই পানিতে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর, কোথাও গলা-সমান পানি তো আবার কোথাও হাঁটুর নিচে পাথরের গুঁড়ি কচমচ করে। দুপপানি ঝরনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর নিচ দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে—লর্ড অব দ্য রিংস মুভির মতো।

সুড়ঙ্গের ভেতরে একেবারেই শুকনো, শান্ত, অদ্ভুত এক নিস্তব্ধ পরিবেশ। ঝরনার ভেতর থেকে ঝরনা দেখার এমন অভিজ্ঞতা আমার এর আগে কখনোই ছিল না। হইহই করে পড়তে থাকা পানির ভেতর দিয়ে ঢোকার সময় পিঠের ওপরে কয়েক মণ চাপ নিয়ে পানি আছড়ে পড়ার যে সুখানুভূতি, সেটা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। এই ঝরনাটা এতই বিশাল যে এর সামনে দাঁড়ালে নিজেকে পিঁপড়ার থেকেও ক্ষুদ্র মনে হয়, চারপাশ দিয়ে ধেয়ে আসা পানির ফোয়ারা দেখে মনের ভেতর থেকেই সবকিছু ফেলে-ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক আসে।

ফিরতি পথে…

ফেরার পথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আমাদের কপাল খারাপ, যে খালে হাঁটুর নিচে পানি নিয়ে পার হয়েছিলাম, সেখানে এখন মাথার তিন হাত ওপর দিয়ে প্রবল বেগে ঘোলা পানি ছুটে যাচ্ছে, বাঁশ-দড়ি-কলাগাছের বাকল—কোনো কিছু দিয়েই কাজ হচ্ছে না। সঙ্গে আছে সাঁতার না জানা তিনজন, কোনোরকমে গাছের গুঁড়ি আর বিশাল বাঁশ দিয়ে ভয়ংকর আগ্রাসী স্রোত পার হয়ে আসতেই আরেক খাল। শেষমেশ এক ভাঙা নৌকায় মাঝিসহ নয়জন চড়ে বসলাম। সেই নৌকা স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটে চলেছে বড় নদীর দিকে।

শেষ বিকেলে আমরা যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা নিয়ে মূল নৌকায় ফেরত আসি, তখন জীবনের মানেটাই আসলে পাল্টে যেতে শুরু করল, কী ভয়াবহ, দুঃস্বপ্নের একটা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। অথচ ফিরলাম সুন্দর একটা ঝরনা দেখার সুখস্মৃতি নিয়ে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে কাপ্তাই গিয়ে সেখানের লঞ্চঘাট থেকে একটা ট্রলার ভাড়া করে বিলাইছড়ির দীঘলছড়ি ক্যাম্প এবং আলিখিয়াং বিজিবি ক্যাম্প পার হয়ে সোজা চলে যাবেন উলুছড়ি। দ্রুতগামী ছোট ট্রলার পাওয়া যায়, এগুলোর ভাড়াও কম। উলুছড়ি থেকে একজন গাইড নিয়ে তিন ঘণ্টা ট্রেক করে ঘুরে আসুন দুপপানি ঝরনা। রোববার ছাড়া অন্যদিন যাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যাবেন। সেনাবাহিনীর তিনটি ক্যাম্প পড়বে, সেখানে পরিচয়পত্র দেখতে চাইবে। অপচনশীল কিছু জঙ্গলে ফেলবেন না, চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না।

সৌজন্য: নকশা, প্রথম আলো

বন মাতানো রাঙামাটি’র দুপপানি ঝরনা

আপনার মতামত দিন....

মতামত