web-ad

ভয়ংকর সৌন্দ্যের্যের রাজ্য বান্দরবানের নাফাখুম

 নাফাখুমএবার ভাবলাম বান্দরবানের থানচিতে গিয়ে নাফাখুম ঘুরে আসি। তো যেই চিন্তা সেই কাজ। পোটলা-পাটলি নিয়ে চলে গেলাম। তবে রাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় ঘুম থেকে উঠে দেখি সাঙ্গু নদী ফুলে-ফেপে বেশ আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। ভাগ্যিস স্রোতের অনুকূলে যেতে হবে। তা না হলে এ স্রোত ঠেলে নৌকা চলাচল করা বেশ কঠিন হতো। ভোরে বড় মদক থেকে যাত্রা শুরু করেছি নাফাখুমের উদ্দেশ্যে। ঢেউ এর মাথায় নাচতে নাচতে স্রোতের সাথে নৌকাও চলছে ঝরো গতিতে। দেশে কায়াকিং (kayaking) বা রিভার র‍্যাফটিং (river rafting) এর জন্য এর চেয়ে ভালো যায়গা সম্ভবত নেই।

এখানকার নৌকাগুলো চালাতে ২ জন লোক লাগে। একজন সামনে বসে পানির নিচে ডুবন্ত বা আংশিক ডুবন্ত পাথরের মাঝ দিয়ে নৌকা চালানোর দিক নির্দেশনা দেন আর অপরজন ইঞ্জিন আর মাস্তুলের নিয়ন্ত্রণ করেন। মাঝি বললেন- ইঞ্জিনগুলো স্প্রিড বোটের, চায়নাতে উৎপাদিত হলেও অধিকাংশই চোরায় পথে বার্মা থেকে আনা।

নাফাখুমে পৌঁছানোর পর স্বয়ংক্রিয় ভাবে আপনার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হবেই ‘ওয়াও’। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যেতে পারলে ভরা বর্ষাতেই নাফাখুম সবচে সুন্দর। পানির পরিমাণের দিক থেকে এটি দেশের সবচেয়ে বড় জল প্রপাত। পুরো রেমাক্রি খাল (সাঙ্গু নদীর থিংদাওয়াল তে এর উৎস মুখের অংশ) প্রায় ৩০ ফিট উপর থেকে এখানে প্রপাতিত হয়েছে।

মারমা ভাষায় ‘খুম’ মানে জলপ্রপাত আর ‘নাফা’ বিশেষ ধরণের উড়ন্ত মাছের নাম (নাতিং মাছ)। আশেপাশে নাতিং মাছের আধিক্য থাকায় এজলপ্রপাতের নাম নাতিংখুম যা পরিবর্তিত হয়ে ‘নাফাখুম’ হয়েছে। প্রপাতের আশেপাশে নাতিং মাছ এখনও দেখা যায়, দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায় নি। বর্ষায় ও নৌকায় নাফাখুম যেতে রেমাক্রি পৌছে নৌকা ঘারে করে রেমাক্রি জলপ্রপাত (৫ফিট মত উঁচু) পার করে আবার নৌকায় উঠতে হয়। থানচি থেকে নাফাখুম গেলে পথে বাড়তি হিসেবে দেখা যায় তিন্দু, বড় পাথর/রাজা পাথর ও রেমাক্রি জলপ্রপাত (রেমাক্রিকে অনেকে দেশের সবচেয়ে চওড়া জলপ্রপাতও বলেন)।

নাফাখুমবর্ষায় প্রায় পুরো রাস্তা নৌকায় যাওয়া যায়। পাড় দিয়ে হেটে গেলে বা শীতকালে (শীতকালে নৌকায় যাওয়া যায় না) রেমাক্রি থেকে আড়াই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। যত ভালো সাঁতারুই হননা কেনো বর্ষায় গেলে লাইফ জ্যাকেট পরে তবেই নৌকায় উঠবেন (কোন দুর্ঘটনা ঘটলে লাইফ জ্যাকেট পড়ার সময় পাওয়া যাবে না। লাইফ জ্যাকেট থানচি বাজারে ও বিজিবি ক্যাফে-তেও ভাড়া পাওয়া যায়। তবে সংখ্যা সীমিত)। সতর্কতা সাঙ্গু নদীর স্রোত আর পাথর বিপদজনক ও দেশের অন্য নদীর বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা। টাকা বাঁচাতে বা মাঝির প্ররোচনায় ৬ জনের অধিক যাত্রী নৌকায় উঠবেন না (এটিই সর্বচ্চ ধারণ ক্ষমতা)।

ফাটাফাটি সব ভিডিও এবং ভিসির খবর পেতে জন্য চোখ রাখো আর সাবস্ক্রাইব করো আমাদের YouTube চ্যানেলে! Youtube: https://goo.gl/WH0ElU

যেভাবে যাবেন : থানচি বান্দরবনের একটি উপজেলা। সাঙ্গু নদীর তির ঘেসে পাহাড় আর নদীর এমন অপুরূপ সৌন্দর্য বাংলাদেশের অর কোথাও থেকে দেখা যায় না। চাঁদের গাড়ি (জিপ) রিজার্ভ করে গেলে সময় লাগবে ৩ ঘণ্টার কাছাকাছি। গড় ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। নিয়মিত বাসে গেলে সময় লাগবে ৪ঘন্টা থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। পথে পরবে শৈল প্রপাত, চিম্বুক আর নীলগিরি। পাবলিক বাস চিম্বুক ও বলিপাড়ায় যাত্রা বিরতি দেয়। সারাদিনে নিয়মিত ভাবে ৫ টা বাস বান্দরবনের থানচি বাসস্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যায় তেমনি থানচি থেকেও বান্দরবন বিভিন্ন সময়ে ৫টি বাস আসে। থানচি যাওয়া বা আসার জন্য মোটর সাইকেল সার্ভিস ভাড়া পাওয়া যায়। থানচিতে খুব ভাল খাবার পাওয়া কঠিন। বিডিআর এর ২টা খাবার হোটেল আছে সেখানে খেতে পারেন।

ঢাকা থেকে বান্দরবান যায় এমন প্রায় ১০/১২ টা পরিবহন আছে। সব থেকে ভালো সার্ভিস পাবেন শ্যামলী পরিবহন এবং হানিফ পরিবহনে। এছাড়াও সেন্টমারটিন সারভিস, ডলফিন, শান্তি, ইউনিক, এস আলমসহ আরো কিছু বাস সার্ভিস আছে। এসি সার্ভিসের মধ্যে শ্যমলী আর সেন্টমারটিন পরিবহন, বাকী সব নন এসি বাস। নন এসি বাস ভাড়া জন প্রতি ৬২০ আর এসি বাস ভাড়া ৯৫০ টাকা। বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে থানচিবাজার বাসস্ট্যান্ড যাবেন অটোতে করে জনপ্রতি ১০-২০ টাকা নিবে।

এখন নৌকা আর মাঝি ঠিক করতে হবে। এখানে আলাদা কোন গাইড নাই। মাঝিরাই গাইডের কাজ করবে। খরচ ডিপেন্ড করবে আপনি কয়দিনের জন্য নৌকা রিসার্ভ করবেন। প্রতিদিনের জন্য প্রায় ৮০০-৯০০টাকা পড়বে।

নাফাখুমমোবাইল নেটওয়ার্ক : থানচি, তিন্দু দুই জায়গাতেই মোবাইল নেটওয়ার্ক (জিপি, রবি, টেলিটক) আছে। নিজের মোবাইল সাথে না নেয়াই ভালো। দোকান থেকেই প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিতে পারবেন। থানচি পর্যন্ত আপনার টেলিটক/রবি/জিপি মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাবেন। তিন্দু গিয়ে আপনার মোবাইলে নেটওয়ার্ক না থাকলেও আপনি একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবেন না। মারমাদের দোকান থেকে বাঁশের উপর এ্যন্টেনা লাগানো সেট থেকে চাইলে বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। কিন্তু রেমাক্রি পৌঁছালে আপনি একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

নোট : চিম্বুকে যাত্রা বিরতির সময় আপনার ক্ষুধা থাকুক বা না থাকুক আর্মি ফুড কর্নারে খেয়ে নেওয়া ভাল। এর চেয়ে ভাল খাবার আপনি থানচির দিকে এগুলে আর পাবেন না।

আপনার মতামত দিন....

মতামত